
চিলাহাটি , ডোমার, নীলফামারী, রংপুর

Md Masum Ahmed
প্রকাশ
২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
খানকায়ে কারামতিয়া শরীফ কমপ্লেক্স চিলাহাটির একটি ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। ইউনুস হাশমী জৈনপুরী (রহ.)-এর দ্বীনি কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই স্থানটি ধর্মীয় শিক্ষা, মাহফিল ও স্থানীয় ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত।
খানকায়ে কারামতিয়া শরীফ কমপ্লেক্স নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার চিলাহাটি এলাকার একটি ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিষ্ঠানটি চিলাহাটি ও আশপাশের মানুষের ধর্মীয় শিক্ষা, ইবাদত, মক্তব শিক্ষা এবং আধ্যাত্মিক চর্চার সঙ্গে যুক্ত। ধর্মীয় পরিবেশ, ঐতিহাসিক পটভূমি এবং স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ও স্মৃতির কারণে এটি চিলাহাটির গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থানগুলোর একটি।
এই কমপ্লেক্সের ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন আওলাদে রাসূল হযরত মাওলানা শাহ্ মো. ইউনুস হাশমী জৈনপুরী (রহ.)। তাঁর চিলাহাটিতে আগমন এবং দ্বীনি কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে যে ধর্মীয় কেন্দ্রের সূচনা হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তা একটি বৃহত্তর কমপ্লেক্সে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ইউনুস হাশমী জৈনপুরী (রহ.) আনুমানিক ১৯৭৪ সালের দিকে চিলাহাটিতে তাঁর দ্বীনি কার্যক্রম শুরু করেন। এর আগে তিনি জামালপুরের সানন্দবাড়ি এলাকায় অবস্থান করতেন। পরবর্তীতে চিলাহাটি ও ভাউলাগঞ্জ এলাকার কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে এই অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ তৈরি হয়।
প্রথমে তিনি ভাউলাগঞ্জে আসেন এবং পরে চিলাহাটির বিশিষ্ট ব্যক্তি ডা. আফসার উদ্দিন বসুনিয়ার বাসায় অবস্থান করেন। সেখান থেকে বর্তমান খানকা শরীফ ও মাজার সংলগ্ন এলাকায় তাঁর দ্বীনি কার্যক্রমের ভিত্তি তৈরি হয়।
প্রথমদিকে একটি ছোট খড়ের ঘর নির্মাণের মাধ্যমে এখানে কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে টিনের মসজিদ ও মক্তব প্রতিষ্ঠিত হয়। ধীরে ধীরে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বিস্তৃত হতে থাকে।
একসময় যে স্থানে ছোট একটি ঘরকে কেন্দ্র করে দ্বীনি কার্যক্রম শুরু হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সেখানে মসজিদ, মক্তব, শিক্ষা কার্যক্রম এবং অন্যান্য স্থাপনা গড়ে ওঠে। এভাবেই স্থানটি ধীরে ধীরে খানকায়ে কারামতিয়া শরীফ কমপ্লেক্স হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
খানকায়ে কারামতিয়া শরীফ কমপ্লেক্সের ইতিহাসে ইউনুস হাশমী জৈনপুরী (রহ.)-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর জীবন ও আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ড নিয়ে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন বর্ণনা প্রচলিত রয়েছে।
তাঁর পরিবার ইরাকি বংশোদ্ভূত বলে স্থানীয়ভাবে বর্ণিত এবং তিনি প্রখ্যাত ইসলামী ব্যক্তিত্ব মাওলানা কেরামত আলী জৈনপুরী (রহ.)-এর দৌহিত্র ছিলেন। তাঁর জীবনী, বংশপরিচয় ও আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চিলাহাটি Archive-এর পৃথক জীবনীমূলক নিবন্ধে দেওয়া আছে।
চিলাহাটিতে তাঁর আগমনের পর ধর্মীয় শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক চর্চার যে ধারার সূচনা হয়, তার স্মৃতি এখনও এই কমপ্লেক্সের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
খানকায়ে কারামতিয়া শরীফ কমপ্লেক্সের পরবর্তী উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণে মাওলানা মঞ্জুর মোরশেদের অবদান স্থানীয়ভাবে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, তিনি বরিশালের একটি মাদ্রাসার প্রিন্সিপালের দায়িত্ব ছেড়ে ইউনুস হাশমী জৈনপুরী (রহ.)-এর সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তীতে তিনি প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন, অফিস, ঘরবাড়ি এবং অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তাঁর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম আরও সংগঠিত ও বিস্তৃত হয় বলে স্থানীয়ভাবে বর্ণিত রয়েছে।
খানকায়ে কারামতিয়া শরীফ কমপ্লেক্সে ধর্মীয় শিক্ষা ও বিভিন্ন আধ্যাত্মিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। মসজিদ ও মক্তবের মাধ্যমে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে ওয়াজ-মাহফিল, ইছালে সওয়াব, দোয়া ও মোনাজাতের আয়োজন করা হয়।
খানকায়ে কারামতিয়া শরীফ কমপ্লেক্সের অন্যতম বড় আয়োজন হলো বার্ষিক ইছালে সওয়াব মাহফিল। প্রতিবছর এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে চিলাহাটি ও আশপাশের এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক ধর্মপ্রাণ মানুষ এখানে সমবেত হন।
মাহফিলে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আলেম ও ধর্মীয় বক্তারা অংশগ্রহণ করেন। আলোচনা, ওয়াজ, ইছালে সওয়াব এবং আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে আয়োজনটি শেষ হয়।
এই বার্ষিক মাহফিল চিলাহাটির ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে একটি পরিচিত আয়োজন হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।
ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি খানকায়ে কারামতিয়া শরীফ কমপ্লেক্সের রয়েছে একটি দীর্ঘ স্থানীয় ইতিহাস। চিলাহাটির একটি তুলনামূলক অনুন্নত এলাকায় ছোট একটি খড়ের ঘর থেকে দ্বীনি কার্যক্রম শুরু হয়ে কীভাবে একটি বড় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে—এই ইতিহাসটি স্থানটির অন্যতম আকর্ষণ।
যারা চিলাহাটির স্থানীয় ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে আগ্রহী, তাদের জন্য এই কমপ্লেক্স একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হতে পারে। এখানে এসে দর্শনার্থীরা প্রতিষ্ঠানটির ধর্মীয় পরিবেশ, মসজিদ, মক্তব ও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান।
বিশেষ করে বার্ষিক মাহফিলের সময় দূর-দূরান্ত থেকে মানুষের আগমন কমপ্লেক্সটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
চিলাহাটি ভ্রমণের সময় খানকায়ে কারামতিয়া শরীফ কমপ্লেক্সকে স্থানীয় ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে ভ্রমণসূচিতে রাখা যেতে পারে। চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে রেল যোগাযোগের মাধ্যমে যুক্ত হওয়ায় দূরের দর্শনার্থীরা ট্রেনে চিলাহাটি এসে স্থানীয় যানবাহনের মাধ্যমে কমপ্লেক্সে যেতে পারেন।
চিলাহাটি এলাকার অন্যান্য ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান ভ্রমণের পাশাপাশি এই কমপ্লেক্স পরিদর্শন করলে এলাকার ধর্মীয় ও সামাজিক ইতিহাস সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া যায়।
খানকায়ে কারামতিয়া শরীফ কমপ্লেক্স ভ্রমণের জন্য নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় আবহাওয়ার দিক থেকে তুলনামূলক আরামদায়ক। তবে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক মাহফিল ও বিশেষ ধর্মীয় আয়োজন দেখতে চাইলে সেই আয়োজনের নির্দিষ্ট তারিখ অনুযায়ী ভ্রমণ পরিকল্পনা করা যেতে পারে।
খানকায়ে কারামতিয়া শরীফ একটি ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠান। তাই এখানে ভ্রমণের সময় ধর্মীয় পরিবেশের প্রতি সম্মান দেখানো উচিত। মসজিদ, খানকা ও ধর্মীয় স্থানে প্রবেশের ক্ষেত্রে স্থানীয় নিয়মকানুন মেনে চলা এবং নামাজ বা ধর্মীয় কার্যক্রম চলাকালে পরিবেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা প্রয়োজন।
বার্ষিক মাহফিলের সময় প্রচুর মানুষের সমাগম হতে পারে। সে সময় স্থানীয় আয়োজকদের নির্দেশনা অনুসরণ করে চলাচল করা এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা ভালো।
অবস্থান: চিলাহাটি বাজার থেকে পশ্চিমে থানা বাজার থেকে ৫০০ মিটার দক্ষিণে এর অবস্থান।




