
উত্তর সড়ক চিলাহাটি বাজার, চিলাহাটি

প্রকাশ: ২৫ সেপ, ২৬
চিলাহাটির শিক্ষা ইতিহাসে চিলাহাটি গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যের নাম। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি চিলাহাটির মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার অন্যতম পরিচিত কেন্দ্র হলেও এর ইতিহাসের শিকড় আরও পুরোনো। এই প্রতিষ্ঠানের বর্তমান রূপ গড়ে ওঠার পেছনে রয়েছে চিলাহাটির শিক্ষানুরাগী মানুষের দীর্ঘদিনের উদ্যোগ, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা, পরবর্তীতে সেটির উচ্চবিদ্যালয়ে রূপান্তর এবং শেষ পর্যন্ত নারী শিক্ষার জন্য পৃথক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক ইতিহাস।
অবিভক্ত ভারতের সময় চিলাহাটি এলাকায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। স্থানীয়ভাবে উচ্চতর জ্ঞানার্জনের জন্য চিলাহাটি বাজারের আশপাশের কারেঙ্গাতলী ও গোমনাতী এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হতো। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিরা চিলাহাটির মানুষের জন্য নিজ এলাকায় একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রয়োজন অনুভব করেন।
এই উদ্যোগের ফল হিসেবে ১৯৪২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় চিলাহাটি মার্চেন্টস বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্থানীয়ভাবে পাওয়া ইতিহাস অনুযায়ী, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য জমি দান করেন মরহুম মনির উদ্দীন চৌধুরী ও মরহুম আজিজার রহমান চৌধুরী। তাঁদের দেওয়া জমিতে মরহুম করিম উদ্দীন প্রামানিক স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন।
চিলাহাটির শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাসে ১৯৪২ সালের এই উদ্যোগ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। পরবর্তী কয়েক দশকে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিকাশের ধারার সঙ্গেই চিলাহাটি গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের ইতিহাস যুক্ত হয়ে যায়।
১৯৪২ সাল থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার পর চিলাহাটির বিদ্যানুরাগী ব্যক্তিরা বিদ্যালয়টিকে আরও উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত করার উদ্যোগ নেন।
১৯৫৪ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামো অনুযায়ী বিদ্যালয়টিকে জুনিয়র হাইস্কুলে উন্নীত করার কার্যক্রম শুরু হয়। ডিডিপিআই, রাজশাহীর অনুমোদনের মাধ্যমে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান চালু করা হয়। এভাবে বিদ্যালয়টি ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত জুনিয়র হাইস্কুল হিসেবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে।
এরপর শিক্ষার সুযোগ আরও সম্প্রসারণের প্রয়োজন দেখা দিলে তৎকালীন সরকারের অনুমোদনক্রমে ১৯৫৯ সালে নবম শ্রেণি এবং ১৯৬০ সালে দশম শ্রেণির পাঠদান শুরু হয়। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি পূর্ণাঙ্গ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে যায়।
চিলাহাটির শিক্ষা ব্যবস্থার এই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সাল একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের বছর। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি একই জমি ও ভবনের ওপর একটি স্বতন্ত্র বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন।
এই উদ্যোগের ফলে ১৯৬৯ সালে চিলাহাটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় নামে পৃথক বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। একই সময়ে চিলাহাটি মার্চেন্টস উচ্চ বিদ্যালয়কে অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়।
বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে যেতে থাকে। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রথমবারের মতো এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে।
প্রথম এসএসসি পরীক্ষায় মোট ২৬ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাঁদের মধ্যে ২২ জন উত্তীর্ণ হয়। সে সময় বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংখ্যা ছিল ৮ জন।
স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালে একটি বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা চিলাহাটির নারী শিক্ষার বিস্তারের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। এর মাধ্যমে স্থানীয় মেয়েদের প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার সুযোগ আরও সুদৃঢ় হয়।
প্রতিষ্ঠার পর কয়েক দশক ধরে বিদ্যালয়টি মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে। সময়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম ও শিক্ষার মান উন্নয়নের পাশাপাশি উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার সুযোগ তৈরির প্রয়োজন দেখা দেয়।
সুযোগ্য পরিচালনা কমিটি ও শিক্ষকদের প্রচেষ্টায় বিদ্যালয়ে উচ্চমাধ্যমিক শাখা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। অবশেষে ২০১০ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমতি পাওয়া যায় এবং ২০১১ সাল থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রী ভর্তি শুরু হয়।
এর মাধ্যমে চিলাহাটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ধীরে ধীরে একটি স্কুল ও কলেজে রূপান্তরিত হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির নাম চিলাহাটি গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ হিসেবে পরিচিত।
উচ্চমাধ্যমিক শাখা চালুর পর থেকেই এখানে তিনটি বিভাগে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা রয়েছে। বিভাগগুলো হলো—
ফলে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার পর স্থানীয় ছাত্রীদের একই প্রতিষ্ঠানে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়েও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
শিক্ষা-তথ্যভিত্তিক বর্তমান রেকর্ডেও প্রতিষ্ঠানটিকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা এই তিন বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার তথ্য পাওয়া যায়।
উচ্চমাধ্যমিক শাখা চালুর পর ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রথমবারের মতো এইচএসসি পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে।
প্রথম এইচএসসি পরীক্ষায় মোট ৭৬ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাঁদের মধ্যে ৬৭ জন উত্তীর্ণ হয়। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে একজন শিক্ষার্থী A+ অর্জন করে।
এটি ছিল প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ১৯৬৯ সালে বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করার কয়েক দশক পর প্রতিষ্ঠানটি উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা ও পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সক্ষমতা অর্জন করে।
পরবর্তী সময়েও প্রতিষ্ঠানটি দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সরকারি শিক্ষা-সংক্রান্ত বিভিন্ন নথিতে EIIN 124844-এর অধীনে চিলাহাটি গার্লস হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের নাম পাওয়া যায়।
প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত ইতিহাস অনুযায়ী বর্তমানে এখানে প্রায় ১,০০০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে এবং শিক্ষক ও কর্মচারী মিলিয়ে সংখ্যা প্রায় ৪৫ জন।
চিলাহাটির শিক্ষা ইতিহাসে এই প্রতিষ্ঠানের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে নারী শিক্ষার প্রসারের সঙ্গে। ১৯৬৯ সালে যখন স্থানীয়ভাবে পৃথক বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখন এর মূল উদ্দেশ্যগুলোর একটি ছিল এলাকার মেয়েদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা।
১৯৭২ সালে প্রথম এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে ২০১১ সালে উচ্চমাধ্যমিক শাখায় ছাত্রী ভর্তি এবং ২০১৩ সালে প্রথম এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ প্রতিটি ধাপই প্রতিষ্ঠানটির ক্রমবিকাশের সাক্ষ্য বহন করে।
একসময় যেখানে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জনের জন্য চিলাহাটির বাইরে যেতে হতো, সেই চিলাহাটিতেই কয়েক দশকের ব্যবধানে মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। এই দীর্ঘ পথচলার পেছনে স্থানীয় শিক্ষানুরাগী মানুষ, শিক্ষক, পরিচালনা কমিটি এবং এলাকাবাসীর বিভিন্ন সময়ের উদ্যোগ ও সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
প্রতিষ্ঠানের নাম: চিলাহাটি গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ
প্রতিষ্ঠার বছর: ১৯৬৯
প্রাথমিক ঐতিহ্যের সূত্র: চিলাহাটি মার্চেন্টস বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৯৪২
EIIN: ১২৪৮৪৪
প্রথম এসএসসি পরীক্ষা: ১৯৭২
প্রথম এসএসসি পরীক্ষার্থী: ২৬ জন
প্রথম এসএসসি উত্তীর্ণ: ২২ জন
উচ্চমাধ্যমিক শাখায় ভর্তি শুরু: ২০১১
প্রথম এইচএসসি পরীক্ষা: ২০১৩
উচ্চমাধ্যমিক বিভাগ: বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক
শিক্ষা বোর্ড: দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ড
অবস্থান: নিজ ভোগডাবাড়ী, ১ নং ভোগডাবাড়ী ইউনিয়ন, ডোমার, নীলফামারী
ডাকঘর: চিলাহাটি, পোস্ট কোড ৫৩৪১
তথ্যসূত্র: প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত ইতিহাস এবং বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS), মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের প্রকাশিত তথ্য।
নারী শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে চিলাহাটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।
উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রী ভর্তি শুরু হয় এবং শিক্ষা কার্যক্রম বিস্তৃত হয়।

