
Md Masum Ahmed
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৫:০৩ এএম

১৯৬৫ সালের ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধের প্রভাবে চিলাহাটি–হলদিবাড়ি রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ৫৫ বছর পর ২০২০ সালে ঐতিহাসিক এই রেলপথ পুনরায় চালু হয়।
১৯৬৫ সালের ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধ চিলাহাটির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সময়। চিলাহাটি তখন পূর্ব পাকিস্তানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তবর্তী রেলকেন্দ্র ছিল। দেশভাগের পরও ভারত ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে রেল যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি; পশ্চিমবঙ্গের হলদিবাড়ি থেকে চিলাহাটি হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে রেল চলাচল করত।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর আন্তর্জাতিক সীমান্ত তৈরি হলেও চিলাহাটি–হলদিবাড়ি রেলপথ চালু ছিল। এই রেলপথের মাধ্যমে ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে পূর্ব পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চল এবং বৃহত্তর উত্তরবঙ্গের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় থাকত। ফলে চিলাহাটি শুধু স্থানীয় একটি রেলস্টেশন ছিল না; এটি সীমান্তবর্তী বাণিজ্য, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।
১৯৬৫ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে দুই দেশের সীমান্ত যোগাযোগের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে। নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারত–পাকিস্তানের মধ্যকার রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। চিলাহাটির ক্ষেত্রেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ছিল চিলাহাটি–হলদিবাড়ি রেল সংযোগের বন্ধ হয়ে যাওয়া।
৬ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫ থেকে এই রেলপথে আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে চিলাহাটি তার পূর্বের আন্তর্জাতিক রেল-ট্রানজিট ভূমিকা হারায় এবং সীমান্তের ওপারের মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে পড়ে।
রেল যোগাযোগ বন্ধ হওয়ার ফলে চিলাহাটির সঙ্গে ভারতের উত্তরবঙ্গের যে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল, সেটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে সীমান্তবর্তী মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আত্মীয়তার যোগাযোগের ওপরও।
যেসব পরিবার, ব্যবসায়ী ও যাত্রী আগে সীমান্তের দুই পাশে রেলপথ ব্যবহার করতেন, তাদের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। চিলাহাটি ধীরে ধীরে একটি আন্তর্জাতিক transit point-এর পরিবর্তে মূলত পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রেল যোগাযোগের অংশে পরিণত হয়।
১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর ভারত–পাকিস্তান সীমান্ত আরও নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। চিলাহাটি যেহেতু সীমান্তের একেবারে কাছাকাছি অবস্থিত, তাই যুদ্ধের পর এর কৌশলগত ও প্রশাসনিক গুরুত্বও বেড়ে যায়। আগের তুলনায় সীমান্ত পারাপার ও যোগাযোগের ওপর নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পায়।
তবে চিলাহাটিতে ১৯৬৫ সালে বড় কোনো স্থলযুদ্ধ বা ব্যাপক বোমাবর্ষণ হয়েছিল—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বর্তমানে পাওয়া যায় না। তাই চিলাহাটির ক্ষেত্রে ১৯৬৫ সালের সবচেয়ে নিশ্চিত ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ছিল সীমান্ত রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া।
১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর চিলাহাটি–হলদিবাড়ি রেলপথ প্রায় ৫৫ বছর বন্ধ ছিল। দীর্ঘ এই সময়ে সীমান্তের দুই পাশের পুরোনো রেল যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
অবশেষে ১৭ ডিসেম্বর ২০২০ সালে চিলাহাটি–হলদিবাড়ি রেল যোগাযোগ পুনরায় চালু হয়। এর মাধ্যমে ১৯৬৫ সালে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক রেলপথ আবার নতুন করে কার্যকর হয়।
চিলাহাটির ইতিহাসে ১৯৬৫ সালের যুদ্ধকে তাই শুধু একটি সামরিক সংঘাত হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যায় না। এই যুদ্ধ চিলাহাটির সীমান্ত যোগাযোগ, রেলপথ, বাণিজ্য এবং মানুষের আন্তঃসীমান্ত যাতায়াতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছিল।
একটি রেলপথ বন্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে চিলাহাটির সঙ্গে ভারতের উত্তরবঙ্গের যে ঐতিহাসিক যোগাযোগ ছিল, তার একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। আবার ২০২০ সালে সেই রেলপথ পুনরায় চালু হওয়ায় চিলাহাটির ইতিহাসে যোগাযোগের সেই পুরোনো অধ্যায়ের একটি নতুন সূচনা হয়।
সংক্ষেপে:
১৯৬৫ সালের যুদ্ধের আগে চিলাহাটি ছিল ভারত–পূর্ব পাকিস্তান রেল যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তকেন্দ্র। যুদ্ধের ফলে ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫ থেকে চিলাহাটি–হলদিবাড়ি রেল সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে সীমান্তবর্তী যাতায়াত ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয় এবং চিলাহাটির আন্তর্জাতিক transit গুরুত্ব দীর্ঘ সময়ের জন্য কমে যায়। প্রায় ৫৫ বছর পর ১৭ ডিসেম্বর ২০২০ সালে রেল সংযোগটি পুনরায় চালু হয়।