
Md Masum Ahmed
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১১:৫৭ এএম

নীলফামারীর ডোমার উপজেলার শব্দিগঞ্জ থেকে কাঁঠালতলী পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ঐতিহাসিক খালকে ঘিরে রয়েছে কৃষি উন্নয়নের এক অসমাপ্ত উদ্যোগের স্মৃতি। স্থানীয় প্রবীণদের বর্ণনা অনুযায়ী, জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বুড়ি তিস্তা নদীর পানি খালের মাধ্যমে কৃষিজমিতে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে খালটি খনন করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে উদ্যোগটি আর পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে।
বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদের ইতিহাসে খাল, নদী ও জলপথের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একসময় এসব জলপথ শুধু পানি নিষ্কাশনের মাধ্যম ছিল না; কৃষিজমিতে সেচের পানি পৌঁছে দেওয়া এবং কৃষিনির্ভর মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার শব্দিগঞ্জ ও কাঁঠালতলী এলাকার একটি পুরোনো খালকে ঘিরেও স্থানীয়ভাবে এমনই একটি উদ্যোগের কথা প্রচলিত রয়েছে।
স্থানীয় প্রবীণদের বর্ণনা অনুযায়ী, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে শব্দিগঞ্জ থেকে কাঁঠালতলী পর্যন্ত খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বুড়ি তিস্তা নদীর পানি খালের মাধ্যমে কৃষিজমিতে পৌঁছে দেওয়া, যাতে এলাকার কৃষকেরা সেচের সুবিধা পেয়ে চাষাবাদে আরও বেশি সুযোগ পান। বর্তমানে খালটির বিভিন্ন অংশের অস্তিত্ব থাকলেও এর মূল পরিকল্পনা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়।
খালটি নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার ভোগডাবুড়ী ইউনিয়নের শব্দিগঞ্জ এলাকার ঈদগাহ মাঠের কাছ থেকে শুরু হয়ে কাঁঠালতলী বাজার পর্যন্ত বিস্তৃত। স্থানীয় পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, খালটির আনুমানিক দৈর্ঘ্য প্রায় পাঁচ কিলোমিটার।
খালটির উৎপত্তিস্থলের কাছাকাছি দিয়ে বুড়ি তিস্তা নদী প্রবাহিত হয়েছে। নদীটি খালের শুরুর অংশ থেকে আনুমানিক ৫০০ মিটার দূরে অবস্থিত। এই ভৌগোলিক অবস্থান খালটির সম্ভাব্য সেচব্যবস্থার উদ্দেশ্য বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় মানুষের কাছে খালটি শুধু একটি পুরোনো জলপথ নয়; এটি এলাকার কৃষি উন্নয়নের একটি অসমাপ্ত পরিকল্পনার স্মৃতিও বহন করে।
বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়ন ও গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণের ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হিসেবে পরিচিত। কৃষিজমিতে সেচের সুবিধা বৃদ্ধি, পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাল খননের কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল।
স্থানীয় প্রবীণদের মুখে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, শব্দিগঞ্জ–কাঁঠালতলী এলাকার খালটিও ওই সময়কার উদ্যোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁদের বর্ণনায়, বুড়ি তিস্তা নদীর পানি খালের মাধ্যমে কৃষিজমিতে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয় কৃষকেরা নদীর পানি ব্যবহার করে চাষাবাদ করতে পারবেন—এমন প্রত্যাশা ছিল বলে জানা যায়।
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, খালটি খননের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বুড়ি তিস্তা নদীর পানি কৃষিজমিতে পৌঁছে দেওয়ার একটি পথ তৈরি করা। বর্ষার ওপর নির্ভরশীল কৃষির পাশাপাশি নদীর পানি ব্যবহার করে জমিতে প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হলে কৃষকেরা উপকৃত হতে পারতেন।
এ ধরনের একটি জলব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে সম্ভাব্যভাবে—
তবে এগুলো পরিকল্পনাটির সম্ভাব্য সুফল; খালটি দিয়ে বাস্তবে বুড়ি তিস্তার পানি প্রবাহিত হয়েছিল কিংবা নিয়মিত সেচ দেওয়া হতো এমন প্রত্যক্ষ প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় প্রবীণদের বর্ণনা অনুযায়ী, খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে পরিকল্পনাটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। স্থানীয়ভাবে এর সঙ্গে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সম্পর্কের কথা বলা হয়।
তবে ঠিক কোন রাজনৈতিক ঘটনা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, অর্থায়নের সমস্যা অথবা কারিগরি জটিলতার কারণে কাজটি থেমে গিয়েছিল, তা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সরকারি নথি, সমসাময়িক সংবাদ প্রতিবেদন বা প্রকল্পের সমাপ্তি-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেলে খালটির ইতিহাস আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে খালটির অবস্থা পরিবর্তিত হয়েছে। স্থানীয় পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বর্তমানে খালটিতে মূলত বর্ষাকালে পানি থাকে। বিভিন্ন অংশে মানুষের দখল ও ব্যবহারের কারণে খালটির স্বাভাবিক বিস্তৃতি এবং জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
খালটির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, স্থানীয় মানুষের মুখে এর একটি অংশ ‘ড্রেনের পাড়’ নামে পরিচিত। এমনকি এই নামের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি পাড়ার নামও প্রচলিত রয়েছে। এটি খালটিকে ঘিরে গড়ে ওঠা স্থানীয় ভূপ্রকৃতি, বসতি এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে এর দীর্ঘ সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়।
একসময় কৃষিজমিতে পানি পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে খনন করা হয়ে থাকলেও, বর্তমানে খালটির পরিচয় অনেকাংশে স্থানীয় বসতি ও এলাকার নামের সঙ্গে মিশে রয়েছে।
শব্দিগঞ্জ থেকে কাঁঠালতলী পর্যন্ত বিস্তৃত এই খাল স্থানীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানযোগ্য অংশ। এর সঙ্গে একদিকে যেমন জিয়াউর রহমানের সময়কার খাল খনন কর্মসূচির সম্ভাব্য যোগসূত্র রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে এলাকার কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং জনবসতির পরিবর্তনের ইতিহাস।
খালটির পুরোনো নকশা, সরকারি ভূমি রেকর্ড, স্থানীয় প্রবীণদের সাক্ষাৎকার এবং সমসাময়িক নথি সংগ্রহ করা গেলে এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ও বাস্তবায়নের ইতিহাস আরও নির্ভরযোগ্যভাবে পুনর্গঠন করা সম্ভব হবে।
এ ধরনের স্থানীয় জলপথের ইতিহাস সংরক্ষণ শুধু অতীতকে জানার জন্য নয়; বরং এলাকার পরিবেশ, কৃষি এবং ঐতিহ্য সম্পর্কে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধারণা দেওয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
শব্দিগঞ্জ–কাঁঠালতলী খাল স্থানীয় মানুষের কাছে একটি পুরোনো জলপথের পাশাপাশি কৃষি উন্নয়নের এক অসমাপ্ত উদ্যোগের স্মৃতি বহন করে। বুড়ি তিস্তার পানি কৃষিজমিতে পৌঁছে দেওয়ার যে পরিকল্পনার কথা স্থানীয় প্রবীণেরা স্মরণ করেন, তা সত্যিই বাস্তবায়নের জন্য নেওয়া হয়েছিল কি না এবং কেন তা পূর্ণতা পায়নি সেসব প্রশ্নের উত্তর পেতে আরও ঐতিহাসিক অনুসন্ধান প্রয়োজন।
খালটির অবশিষ্ট অংশ, ‘ড্রেনের পাড়’ নামের স্থানীয় পরিচয় এবং প্রবীণদের স্মৃতিচারণ ভবিষ্যতে এই ইতিহাস অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে। যথাযথ নথি ও সাক্ষ্য সংগ্রহের মাধ্যমে শব্দিগঞ্জ–কাঁঠালতলী খালের অতীতকে আরও সুস্পষ্টভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব।





