
চিলাহাটি, ডোমার, নীলফামারী, রংপুর

Md Masum Ahmed
প্রকাশ
২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশন উত্তরবঙ্গের একটি ঐতিহাসিক রেল যোগাযোগকেন্দ্র। ঢাকা, রাজশাহী ও খুলনাসহ বিভিন্ন গন্তব্যে ট্রেন চলাচলের পাশাপাশি চিলাহাটি–হলদিবাড়ী রেল সংযোগের কারণে স্টেশনটির ঐতিহাসিক গুরুত্বও রয়েছে।
চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশন নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার চিলাহাটি এলাকায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে স্টেশন। ব্রিটিশ আমল থেকে উত্তরবঙ্গের রেল যোগাযোগের সঙ্গে চিলাহাটির নাম জড়িয়ে আছে। বর্তমানে এটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ রেল যোগাযোগকেন্দ্র এবং বাংলাদেশ-ভারত রেল সংযোগের অন্যতম প্রবেশপথ।
চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশনের ইতিহাস উনিশ শতকের শেষভাগের উত্তরবঙ্গের রেল যোগাযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। ১৮৭৮ সালে কলকাতা থেকে উত্তরবঙ্গ হয়ে শিলিগুড়ি পর্যন্ত রেল যোগাযোগ গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় চিলাহাটি এই গুরুত্বপূর্ণ রেলপথের অংশ হয়ে ওঠে। তৎকালীন রেলপথটি কলকাতা–রানাঘাট–ভেড়ামারা–সান্তাহার–পার্বতীপুর–নীলফামারী–হলদিবাড়ী–শিলিগুড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
ব্রিটিশ আমলে উত্তরবঙ্গ ও আসামের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই রেলপথের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ফলে কলকাতা ও শিলিগুড়ির মধ্যকার পুরোনো রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপরও চিলাহাটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশন হিসেবে তার ভূমিকা ধরে রাখে।
চিলাহাটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য হলো চিলাহাটি–হলদিবাড়ী রেল সংযোগ। দেশভাগের পরও এই রেলপথ দিয়ে ভারত ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে ট্রেন চলাচল করত। কিন্তু ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর এই সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশ ও ভারতের উদ্যোগে পুরোনো রেল সংযোগটি পুনরায় চালু করার কাজ শুরু হয়।
২০২০ সালের ১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের ভার্চুয়াল সম্মেলনে চিলাহাটি–হলদিবাড়ী রেল সংযোগ পুনরায় উদ্বোধন করা হয়। পরবর্তীতে ২০২১ সালের ১ আগস্ট এই পথে নিয়মিত পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হয়। বাংলাদেশের চিলাহাটি স্টেশন থেকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পর্যন্ত নতুন রেলপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ৭.৫ কিলোমিটার।
এই পুনঃসংযোগের ফলে চিলাহাটি আবারও ভারতীয় রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত হয়। এর মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের রেল যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বর্তমানে চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশন থেকে সরাসরি ঢাকা, রাজশাহী ও খুলনা রুটে আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করে। প্রধান আন্তঃনগর ট্রেনগুলো হলো—
চিলাহাটি এক্সপ্রেস (৮০৬)
চিলাহাটি থেকে ঢাকার মধ্যে চলাচলকারী আন্তঃনগর ট্রেন। উত্তরবঙ্গ থেকে রাজধানী ঢাকায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রেল পরিষেবা।
নীলসাগর এক্সপ্রেস (৭৬৬)
চিলাহাটি থেকে ঢাকার মধ্যে চলাচলকারী আরেকটি আন্তঃনগর ট্রেন। এটি উত্তরবঙ্গের যাত্রীদের রাজধানীর সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ প্রদান করে।
বরেন্দ্র এক্সপ্রেস (৭৩২)
চিলাহাটি থেকে রাজশাহী রুটে চলাচলকারী আন্তঃনগর ট্রেন। এর মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের চিলাহাটি অঞ্চল থেকে রাজশাহী বিভাগের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা যায়।
তিতুমীর এক্সপ্রেস (৭৩৪)
চিলাহাটি–রাজশাহী রুটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃনগর ট্রেন। রাজশাহীসহ পথের বিভিন্ন স্টেশনে যাতায়াতের জন্য এই ট্রেন ব্যবহৃত হয়।
রূপসা এক্সপ্রেস (৭২৮)
চিলাহাটি থেকে খুলনা রুটে চলাচলকারী আন্তঃনগর ট্রেন। এর মাধ্যমে উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শহর খুলনার সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ রয়েছে।
সীমান্ত এক্সপ্রেস (৭৪৮)
চিলাহাটি থেকে খুলনার মধ্যে চলাচলকারী আরেকটি আন্তঃনগর ট্রেন। উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে যাত্রী পরিবহনে এই ট্রেনের ভূমিকা রয়েছে।
বর্তমানে চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশন থেকে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে আন্তঃনগর ট্রেনে যাতায়াত করা যায়। বিশেষ করে ঢাকা, রাজশাহী ও খুলনা রুটে সরাসরি ট্রেন যোগাযোগ চিলাহাটির গুরুত্বকে আরও বাড়িয়েছে।
চিলাহাটি থেকে রেলপথে যাওয়া যায়—
চিলাহাটি–পার্বতীপুর–সান্তাহার–দর্শনা রেললাইনটি বাংলাদেশের একটি দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ, যার মাধ্যমে চিলাহাটি দেশের দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলের রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
পর্যটকদের কাছে চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশনের গুরুত্ব শুধু যাতায়াতের কারণে নয়; এর রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক গুরুত্ব। স্টেশনটি উত্তরবঙ্গের পুরোনো রেল যোগাযোগের স্মৃতি বহন করছে এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত রেল যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
চিলাহাটি থেকে রেলপথে ঢাকায় যাওয়া যায়। আবার রাজশাহী ও খুলনার মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরের সঙ্গেও সরাসরি রেল যোগাযোগ রয়েছে। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পর্যটকরা ট্রেনে চিলাহাটি এসে আশপাশের দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখতে পারেন।
চিলাহাটি সীমান্তবর্তী হওয়ায় এখানকার রেলপথের সঙ্গে ভারতীয় পশ্চিমবঙ্গের হলদিবাড়ী এবং বৃহত্তর উত্তরবঙ্গের ঐতিহাসিক রেল যোগাযোগের সম্পর্কও রয়েছে। পুনঃস্থাপিত চিলাহাটি–হলদিবাড়ী রেল সংযোগ উত্তরবঙ্গের পর্যটন ও আঞ্চলিক যোগাযোগের ইতিহাসে নতুন গুরুত্ব যোগ করেছে।
চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলো হলো—
একটি সাধারণ রেলস্টেশনের চেয়ে চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশনের গুরুত্ব অনেক বিস্তৃত। প্রায় দেড় শতাব্দীর রেল ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত এই স্টেশন উত্তরবঙ্গের যোগাযোগব্যবস্থা, বাণিজ্য, সীমান্ত যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী।
বিশেষ করে ১৯৬৫ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া চিলাহাটি–হলদিবাড়ী রেল সংযোগ পুনরায় চালু হওয়ার মাধ্যমে চিলাহাটি আবারও আন্তর্জাতিক রেল যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে ইতিহাস, রেলভ্রমণ এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য এই তিন দিক থেকেই চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশন পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় একটি স্থান।




