Nav-logo
Md Masum Ahmed

Md Masum Ahmed

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৫:১০ পিএম

খাদেমুল ইসলাম বসুনিয়া

খাদেমুল ইসলাম বসুনিয়া

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

খাদেমুল ইসলাম বসুনিয়া ছিলেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট গণসংগীতশিল্পী, সুরকার, গীতিকার ও সংগীত প্রযোজক। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত এই শিল্পী ‘আমার এ দেশ সব মানুষের’ গানটির সুরকার হিসেবে বিশেষভাবে স্মরণীয়।

জীবনতথ্য

জন্ম

১ জানুয়ারি, ১৯৩৮

মৃত্যু

২৭ ডিসেম্বর, ২০১৭

জন্মস্থান

রংপুর

পেশা

গীতিকার ও সংগীত প্রযোজক

শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী

মুক্তিযোদ্ধা

খাদেমুল ইসলাম বসুনিয়া

পরিচিতি

গণসংগীতশিল্পী

আমার এ দেশ সব মানুষের’ গানের সুরকার

সুরকার

গীতিকার ও সংগীত প্রযোজক

জীবনী

খাদেমুল ইসলাম বসুনিয়া ছিলেন বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের একজন বিশিষ্ট গণসংগীতশিল্পী, সুরকার, গীতিকার ও সংগীত প্রযোজক। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত এই শিল্পী মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশাত্মবোধক গানকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে ‘আমার এ দেশ সব মানুষের’ গানটির সুরকার হিসেবে তাঁর নাম বাংলাদেশের সংগীত ও মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে আছে।

সংগীতজীবনের সূচনা

খাদেমুল ইসলাম বসুনিয়ার পেশাগত সংগীতজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় রংপুর বেতার কেন্দ্রকে ঘিরে। ১৯৬৭ সালে রংপুর বেতার কেন্দ্রের যাত্রার সময় তিনি সংগীত পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই বছরের ২৫ ডিসেম্বর রংপুর বেতার কেন্দ্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি প্রথম সংগীত পরিচালক হিসেবে সংগীত পরিচালনা করেছিলেন বলে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

পরবর্তীতে তিনি রংপুর বেতারে নৈমিত্তিক সংগীত প্রযোজক হিসেবে যুক্ত হন। তাঁর সংগীতচর্চার পাশাপাশি রংপুর অঞ্চলের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ভূমিকা ছিল। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মী ও শিল্পীকে সংগঠিত করে তিনি গণসংগীত ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় খাদেমুল ইসলাম বসুনিয়া স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন এবং মানুষের মধ্যে দেশাত্মবোধ ও স্বাধীনতার চেতনা জাগিয়ে তুলতে গান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সেই সাংস্কৃতিক সংগ্রামের অংশ হিসেবেই তিনি সংগীতশিল্পী ও সুরকার হিসেবে কাজ করেন।

তাঁর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যে গানটি স্মরণ করা হয়, সেটি হলো ‘ছোটদের বড়দের সকলের, আমার এ দেশ সব মানুষের’। গানটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়েছিল এবং রথীন্দ্রনাথ রায়ের কণ্ঠে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। খাদেমুল ইসলাম বসুনিয়াকে এই গানের সুরকার হিসেবে একাধিক সংবাদসূত্র উল্লেখ করেছে।

গানটির মূল বক্তব্য ছিল ধর্ম, শ্রেণি ও পেশাভেদ অতিক্রম করে দেশের সব মানুষের ঐক্য ও সমঅধিকারের কথা তুলে ধরা। মুক্তিযুদ্ধের সময় এমন গান মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম ও ঐক্যের অনুভূতি জাগাতে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ভূমিকা পালন করেছিল।

বাংলাদেশ বেতারে কর্মজীবন

মুক্তিযুদ্ধের পরও খাদেমুল ইসলাম বসুনিয়া বাংলাদেশ বেতারের সঙ্গে দীর্ঘ সময় যুক্ত ছিলেন। ১৯৭৩ সালে তিনি বাংলাদেশ বেতারে নিজস্ব সংগীত প্রযোজক হিসেবে দায়িত্ব পান। পরে ১৯৯৩ সালে পদোন্নতি পেয়ে রাজশাহী বেতারে মুখ্য সংগীত প্রযোজকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৭ সালে তিনি বাংলাদেশ বেতারের প্রিন্সিপাল মিউজিক প্রডিউসার পদে পদোন্নতি পান। ২০০১ সালে তিনি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

তবে অবসর গ্রহণের পরও সংগীতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শেষ হয়নি। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ বেতারের ‘ক’ বিশেষ শ্রেণির সংগীতশিল্পী হিসেবে সংগীতচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

গণসংগীত ও সুরসৃষ্টিতে অবদান

খাদেমুল ইসলাম বসুনিয়া মূলত গণসংগীতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। সুরকার ও সংগীত প্রযোজক হিসেবে তিনি বিভিন্ন গানকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে কাজ করেন। তাঁর সুর করা গানগুলোর মধ্যে ‘আমার এ দেশ সব মানুষের’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এ ছাড়া শামসুর রাহমানের ‘দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে’ এবং আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ‘কুমড়ো ফুলে ফুলে’সহ বিভিন্ন গণসংগীতের সঙ্গেও তাঁর নাম যুক্ত রয়েছে।

তাঁর সংগীতচর্চার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সাধারণ মানুষের জীবন, দেশপ্রেম, সামাজিক ঐক্য ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে সংগীতের মাধ্যমে তুলে ধরা। এ কারণে তাঁর কাজ বাংলাদেশের গণসংগীতের ধারার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে সম্পর্কিত।

রংপুরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ভূমিকা

খাদেমুল ইসলাম বসুনিয়া শুধু বেতারের সংগীত প্রযোজক বা সুরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেননি; রংপুর অঞ্চলের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে দেশে গণআন্দোলনের সময় তিনি সাংস্কৃতিক কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে রংপুর অঞ্চলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

এই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তিনি সংগীতকে শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং মানুষের মধ্যে সচেতনতা ও সামাজিক সংহতি তৈরির মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করেছেন।

ব্যক্তিগত জীবন

ব্যক্তিগত জীবনে খাদেমুল ইসলাম বসুনিয়া চিলাহাটি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রাক্তন শিক্ষক মরহুম বাবুল স্যারের বড় ছেলে ছিলেন। চিলাহাটির সঙ্গে তাঁর পারিবারিক এই সম্পর্ক স্থানীয় ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেও তাঁর পরিচিতিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

মৃত্যু

দীর্ঘ সংগীতজীবনের অবসান ঘটে ২০১৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর রাতে। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৭৯ বছর।

তাঁর মরদেহ প্রথমে রংপুর বেতার কেন্দ্রে নেওয়া হয়। পরে রংপুর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং রংপুরের নূরপুর কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

সংগীতাঙ্গনে স্মরণীয় অবদান

খাদেমুল ইসলাম বসুনিয়ার সংগীতজীবন কয়েক দশকজুড়ে বিস্তৃত। রংপুর বেতারে সংগীত পরিচালনা দিয়ে শুরু করে বাংলাদেশ বেতারের সংগীত প্রযোজক, মুখ্য সংগীত প্রযোজক ও প্রিন্সিপাল মিউজিক প্রডিউসার হিসেবে দায়িত্ব পালন তাঁর কর্মজীবন বাংলাদেশের বেতার ও সংগীতাঙ্গনের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত।

তবে তাঁর সবচেয়ে স্মরণীয় অবদানগুলোর একটি হয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রচারিত ‘আমার এ দেশ সব মানুষের’ গানের সুরারোপ। স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত এই গান তাঁকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে।

আপনার কাছে কি চিলাহাটির কোনো তথ্য আছে?

আপনার কাছে থাকা পুরোনো ছবি, দলিল, গল্প বা স্মৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হোন।