
আওলাদে রাসূল ইউনুস হাশমী জৈনপুরী (রহ.)
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
আওলাদে রাসূল ইউনুস হাশমী জৈনপুরী (রহ.) চিলাহাটির একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। ১৯৭৪ সালের দিকে চিলাহাটিতে এসে তিনি খানকা, মসজিদ ও মক্তব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দ্বীনি শিক্ষা ও ধর্মীয় কার্যক্রমের সূচনা করেন।
জীবনতথ্য
মৃত্যু
জন্মস্থান
ইরাক
পেশা
ধর্ম প্রচারক
ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব
পরিচিতি
খানকা প্রতিষ্ঠা
মক্তব প্রতিষ্ঠা
দ্বীনি শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা
আওলাদে রাসূল ইউনুস হাশমী জৈনপুরী (রহ.) চিলাহাটি অঞ্চলের একজন পরিচিত আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর আগমন ও দ্বীনি কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে চিলাহাটির একটি অপেক্ষাকৃত অনুন্নত এলাকায় ধর্মীয় শিক্ষা, ইবাদত ও আধ্যাত্মিক চর্চার একটি কেন্দ্র গড়ে ওঠে। তিনি খানকা, মসজিদ ও মক্তব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের মধ্যে দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
ইউনুস হাশমী জৈনপুরী (রহ.)-এর পরিবার ইরাকি বংশোদ্ভূত বলে স্থানীয়ভাবে বর্ণিত। তাঁর পূর্বপুরুষগণ আরব অঞ্চল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে আগমন করেন বলে জানা যায়। তিনি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা কেরামত আলী জৈনপুরী (রহ.)-এর দৌহিত্র (মেয়ের ঘরের নাতি) ছিলেন।
এই পারিবারিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের কারণে তাঁর সঙ্গে জৈনপুরী ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে তাঁর আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ড উত্তরবঙ্গের এই অঞ্চলেও প্রভাব বিস্তার করে।
চিলাহাটিতে আসার আগে ইউনুস হাশমী জৈনপুরী (রহ.) জামালপুরের সানন্দবাড়ি এলাকায় অবস্থান করতেন। স্থানীয় মানুষের বর্ণনা অনুযায়ী, সেখানে অবস্থানকালে তাঁর জীবনের সঙ্গে বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনা বা কেরামতের কথা প্রচলিত রয়েছে। এসব বর্ণনা স্থানীয়ভাবে তাঁর আধ্যাত্মিক মর্যাদা ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।
সানন্দবাড়িতে অবস্থানকালে তাঁর জন্য খানকা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে প্রায় ৮০ বিঘা জমি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল বলেও স্থানীয়ভাবে জানা যায়। তবে পরবর্তীতে তিনি সেই প্রস্তাব গ্রহণ না করে চিলাহাটিকে তাঁর দ্বীনি কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেন।
চিলাহাটি ও ভাউলাগঞ্জ এলাকার বেশ কিছু মানুষ সে সময় জামালপুরের সানন্দবাড়িতে কর্মরত বা বসবাস করতেন। তাঁদের মাধ্যমেই ইউনুস হাশমী জৈনপুরী (রহ.)-এর সঙ্গে চিলাহাটি ও আশপাশের এলাকার মানুষের যোগাযোগ তৈরি হয়।
তাঁর চিলাহাটিতে আগমনের ঘটনাটি কয়েকটি পর্যায়ে সংঘটিত হয় বলে স্থানীয়ভাবে বর্ণনা পাওয়া যায়।
সানন্দবাড়ির পরিচিত ব্যক্তিদের আমন্ত্রণে তিনি প্রথমে ভাউলাগঞ্জে আসেন। সেখানে তিনি তোয়াবুর সরকারের বাসায় অবস্থান করেন।
পরবর্তীতে তিনি চিলাহাটির বিশিষ্ট ব্যক্তি ডা. আফসার উদ্দিন বসুনিয়ার বাসায় যান এবং সেখানে কিছুদিন অবস্থান করেন। এই সময় থেকেই চিলাহাটিতে তাঁর স্থায়ীভাবে দ্বীনি কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি সামনে আসে।
ডা. আফসার উদ্দিন বসুনিয়ার বাড়িতে অবস্থানকালে ইউনুস হাশমী জৈনপুরী (রহ.) একটি খানকা প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এরপর তাঁকে বর্তমান মাজার ও খানকা শরীফ সংলগ্ন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।
স্থানীয় বর্ণনা অনুযায়ী, সে সময় এলাকাটি ছিল তুলনামূলকভাবে অনুন্নত এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ডও ছিল সীমিত। পাশাপাশি এলাকাটি নিরাপত্তার দিক থেকেও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল বলে স্থানীয় প্রবীণদের বর্ণনায় পাওয়া যায়। এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই তিনি সেখানে দ্বীনি কার্যক্রম শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন।
সানন্দবাড়িতে খানকা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রায় ৮০ বিঘা জমি দেওয়ার প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও তিনি চিলাহাটিকে বেছে নেন বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে।
তৎকালীন সময়ে বর্তমান খানকা শরীফ সংলগ্ন এলাকাটি ছিল অনেকটাই জনবিচ্ছিন্ন ও অনুন্নত। স্থানীয় বর্ণনা অনুযায়ী, ওই এলাকায় ছিনতাই ও ডাকাতির মতো অপরাধের ঘটনাও ঘটত। কাছাকাছি ছিটমহল থাকায় অপরাধীরা সেখানে আশ্রয় নিতে পারত বলে স্থানীয়দের মধ্যে ধারণা ছিল। ফলে অনেক সময় কয়েকজন একসঙ্গে ছাড়া ওই এলাকায় চলাচল করাও কঠিন ছিল।
ধর্মীয় ক্ষেত্রেও এলাকাটিতে তখন দ্বীনি শিক্ষা ও নিয়মিত নামাজ-রোজার চর্চা তুলনামূলকভাবে কম ছিল বলে স্থানীয়ভাবে বর্ণিত হয়। এমন একটি পরিবেশেই তিনি দ্বীনি শিক্ষা ও ধর্মীয় চর্চার একটি কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।
চিলাহাটিতে আগমনের পর, আনুমানিক ১৯৭৪ সালের দিকে ইউনুস হাশমী জৈনপুরী (রহ.) তাঁর দ্বীনি কার্যক্রমের প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপন করেন।
প্রথমদিকে একটি ছোট খড়ের ঘর নির্মাণ করে সেখানে কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে সেখানে টিনের মসজিদ এবং একটি মক্তব প্রতিষ্ঠিত হয়। ধীরে ধীরে স্থানটি স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে থাকে।
তাঁর জীবদ্দশায় অন্তত দুটি বড় মাহফিল আয়োজনের কথাও স্থানীয়ভাবে জানা যায়। এসব মাহফিলের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মৃতদের জন্য ঈসালে সওয়াব এবং জীবিত মানুষের মধ্যে দ্বীনি শিক্ষা ও ধর্মীয় সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
এই প্রতিষ্ঠানটির পরবর্তী অবকাঠামোগত উন্নয়নে মাওলানা মঞ্জুর মোরশেদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি বরিশালের একটি মাদ্রাসার প্রিন্সিপালের দায়িত্ব ছেড়ে ইউনুস হাশমী জৈনপুরী (রহ.)-এর সঙ্গে যুক্ত হন।
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁদের প্রথম যোগাযোগ স্বপ্নের মাধ্যমে হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি চিলাহাটিতে এসে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হন এবং অফিস, ঘরবাড়ি ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
বর্তমানে তাঁর ছেলে মাসুম হুজুর এই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করছেন বলে প্রদত্ত তথ্য থেকে জানা যায়।
ইউনুস হাশমী জৈনপুরী (রহ.) পারিবারিক জীবনেও কয়েকজন সন্তান রেখে গেছেন।
তাঁর একমাত্র পুত্র ড. তাজ হাশমী বর্তমানে কানাডার টরন্টোতে বসবাস করছেন। তাঁর দুইজন কন্যা সন্তান রয়েছেন তাঁদের মধ্যে একজন কানাডায় এবং অন্যজন ঢাকায় বসবাস করছেন।
তাঁর সহধর্মিণী ঢাকায় ইন্তেকাল করেন এবং সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়।
ইউনুস হাশমী জৈনপুরী (রহ.) ১৯৭৬ সালে ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকালের পরও তাঁর প্রতিষ্ঠিত দ্বীনি কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে এবং সময়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির পরিধি বৃদ্ধি পায়।
আজ তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রটি চিলাহাটি অঞ্চলে দ্বীনি শিক্ষা ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের একটি পরিচিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এখানে প্রায় ৩৫০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে এবং শিক্ষক ও কর্মচারী মিলিয়ে প্রায় ২০ জন দায়িত্ব পালন করছেন।
চিলাহাটিতে ইউনুস হাশমী জৈনপুরী (রহ.)-এর আগমন স্থানীয় ধর্মীয় ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। সীমিত সুযোগ-সুবিধা ও প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে একটি ছোট খড়ের ঘর দিয়ে যে দ্বীনি কার্যক্রমের সূচনা হয়েছিল, তা পরবর্তীতে মসজিদ, মক্তব ও বৃহত্তর শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়।
তাঁর প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রটি পরবর্তী সময়ে স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় শিক্ষা, ইবাদত ও আধ্যাত্মিক চর্চার সঙ্গে যুক্ত হয়ে চিলাহাটির সামাজিক ও ধর্মীয় পরিমণ্ডলে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করে।
তথ্যসূত্র: মাসুম হুজুর (প্রদত্ত মৌখিক/স্থানীয় তথ্য)
আপনার কাছে থাকা পুরোনো ছবি, দলিল, গল্প বা স্মৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হোন।

