
অ্যাডঃ দবির উদ্দিন আহমেদ
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
ভাষা সৈনিক অ্যাডভোকেট দবির উদ্দিন আহমেদ (১৯০৩–১৯৯৩) ছিলেন নীলফামারীর একজন বিশিষ্ট আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও ভাষা আন্দোলনের কর্মী। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়ে তিনি কারাবরণ করেন এবং ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। আইন পেশা, রাজনীতি ও জনসেবায় তাঁর দীর্ঘ অবদান স্থানীয় ইতিহাসে স্মরণীয়।
জীবনতথ্য
জন্ম
১ জানুয়ারি, ১৯০৩
মৃত্যু
৯ জুলাই, ১৯৯৩
জন্মস্থান
উত্তর ভোগডাবুড়ী চিলাহাটি
পেশা
ভাষা সৈনিক
রাজনীতিবিদ
মুক্তিযোদ্ধা
ভাষা সৈনিক
পরিচিতি
ভাষা সৈনিক
দবির উদ্দিন আহমেদ
১৯৫২ ভাষা আন্দোলন
অ্যাডভোকেট
ভাষা সৈনিক অ্যাডভোকেট দবির উদ্দিন আহমেদ ছিলেন একজন বিশিষ্ট আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও ভাষা আন্দোলনের অন্যতম স্থানীয় কর্মী। ব্রিটিশ ভারত থেকে পাকিস্তান আমল এবং পরবর্তী সময় পর্যন্ত তিনি নীলফামারীর সামাজিক, রাজনৈতিক ও আইন অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে তিনি কারাবরণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
দবির উদ্দিন আহমেদ ১৯০৩ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের নীলফামারী মহকুমার ডোমার থানার ভোগডাবুড়ী ইউনিয়নের উত্তর ভোগডাবুড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন মৃত আমির উদ্দিন আহমেদ প্রামানিক এবং মাতা চন্দন বিবি প্রামানিক।
বাংলা ১৩০৯ সনে জন্মগ্রহণকারী দবির উদ্দিন আহমেদ শৈশব থেকেই শিক্ষার প্রতি আগ্রহী ছিলেন। তাঁর পরিবারের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত উত্তর ভোগডাবুড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই তাঁর প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয়।
প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর তিনি কিছুদিন কারেঙ্গাতলী নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। এরপর নীলফামারী সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন।
১৯২২ সালে তিনি নীলফামারী সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় যান এবং ১৯২৪ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বোর্ড অব ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
পরবর্তীতে তিনি কারমাইকেল কলেজে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯২৬ সালে বিএ ডিগ্রি এবং ১৯২৮ সালে এলএলবি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
শিক্ষাজীবন শেষ করার পর ১৯২৮ সালেই দবির উদ্দিন আহমেদ আইন পেশায় যুক্ত হন। এরপর আমৃত্যু নীলফামারী জেলায় আইনজীবী হিসেবে পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন।
আইন পেশায় দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি নীলফামারীর আইন অঙ্গনে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। তিনি দীর্ঘদিন নীলফামারী জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
দবির উদ্দিন আহমেদের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় পাকিস্তান আমলে। প্রথমদিকে তিনি কিছু সময় মুসলিম লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের অধিকার ও মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে পরিচালিত আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ তাঁকে ভাষা সৈনিক হিসেবে পরিচিত করে তোলে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দবির উদ্দিন আহমেদ সেই আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
মাতৃভাষা বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে তিনি ১৯৫২ সালে কারাবরণ করেন। ভাষার জন্য তাঁর এই ত্যাগ তাঁকে নীলফামারী অঞ্চলের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে স্মরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
ভাষা আন্দোলনের পর পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে দবির উদ্দিন আহমেদ পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
এই নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি আইন পরিষদে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান এবং তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত হয়।
দবির উদ্দিন আহমেদ শুধু আইন ও জাতীয় রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না স্থানীয় প্রশাসন ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও তাঁর ভূমিকা ছিল। তিনি দীর্ঘদিন তৎকালীন রংপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।
এই দায়িত্ব পালনকালে তিনি বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের বিভিন্ন সামাজিক ও জনসম্পৃক্ত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
পরবর্তী সময়ে দবির উদ্দিন আহমেদ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)-এর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি সাধারণ মানুষের অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন।
দীর্ঘ কর্মময় জীবন শেষে ভাষা সৈনিক অ্যাডভোকেট দবির উদ্দিন আহমেদ ১৯৯৩ সালের জুলাই মাসে মৃত্যুবরণ করেন।
আইন পেশা, রাজনীতি, স্থানীয় নেতৃত্ব এবং বিশেষ করে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি নীলফামারী অঞ্চলের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান তৈরি করেছেন। তাঁর জীবন ও কর্ম স্থানীয় ইতিহাসের পাশাপাশি বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ও রাজনৈতিক ইতিহাসেরও একটি উল্লেখযোগ্য অংশ।
তথ্যসূত্রঃ দৈনিক দেশচিত্র , বাংলাদেশ তথ্য বাতায়ন
আপনার কাছে থাকা পুরোনো ছবি, দলিল, গল্প বা স্মৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হোন।

