
চিলাহাটি, চিলাহাটি বাজার

প্রকাশ: ২৫ সেপ, ২৬
চিলাহাটি সরকারি কলেজ বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার চিলাহাটিতে অবস্থিত একটি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। চিলাহাটি ও আশপাশের এলাকার মানুষের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টিতে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের ভূমিকা রয়েছে। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করা এই কলেজ সময়ের সঙ্গে অবকাঠামো ও শিক্ষা কার্যক্রমে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বর্তমান অবস্থানে পৌঁছেছে।
তিস্তা-করতোয়ার মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ পলিমাটির অঞ্চলের সাধারণ মানুষের প্রধান পেশা ছিল কৃষি। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের এই অঞ্চলেও শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় মানুষের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ঘটানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন শিক্ষানুরাগী আ. তা. ম. জহিরুল ইসলাম।
জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে তিনি নীলফামারী, রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরে জ্ঞান অর্জন করেন। পরবর্তীতে অর্জিত জ্ঞান নিজ এলাকার মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে তিনি স্থানীয় বন্ধু-বান্ধব, গণ্যমান্য ও সচেতন ব্যক্তিদের সঙ্গে পরামর্শ করতে থাকেন।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের মতো মৌলিক প্রয়োজন পূরণই যেখানে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ছিল আরও কঠিন কাজ। এমন একটি সময়ে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা এবং কয়েকজন সমাজহিতৈষী ও নিঃস্বার্থ মানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯৭৩ সালে চিলাহাটি কলেজের একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়।
প্রথমদিকে বর্তমান মার্চেন্ট স্কুলের একটি আধাপাকা কক্ষের মাঝখানে বাঁশের বেড়া দিয়ে পার্টিশন তৈরি করে দুটি শ্রেণিকক্ষ বানানো হয়। পাশেই অধ্যক্ষের জন্য একটি ছোট কক্ষে অফিস স্থাপন করা হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের সময় মার্চেন্ট স্কুলটি পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে চিলাহাটি ও সীমান্তবর্তী এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী ও যৌথ বাহিনীর মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ হয়। ৬ ডিসেম্বর ভারতীয় বিমানবাহিনী পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প লক্ষ্য করে ব্যাপক বোমা হামলা চালালে পাকিস্তানি বাহিনী ক্যাম্প ছেড়ে চলে যায়। এতে মার্চেন্ট স্কুলের প্রায় সব ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে সেই ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের একটি অংশ সংস্কার করে চিলাহাটি কলেজের কার্যক্রম শুরু করা হয়।
তৎকালীন সময়ে আশপাশে কোনো কলেজ না থাকায় প্রতিষ্ঠার প্রথম একাডেমিক বছরেই এই কলেজে ৭৩ জন ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়েছিল।
চিলাহাটি কলেজের প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষ ছিলেন আ. তা. ম. জহিরুল ইসলাম এবং প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি ছিলেন জহিদুল ইসলাম।
প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষকবৃন্দের মধ্যে ছিলেন—
১. আব্দুল কাদের মুকুল
২. নজরুল আলম প্রধান
৩. খোরশেদুল আলম দুলু
৪. হেনা মিয়া — শারীরিক শিক্ষা শিক্ষক
১। মাহমুদ হোসেন — প্রধান সহকারী
২। আতিয়ার রহমান
কলেজ প্রতিষ্ঠার সময় স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
১। খায়রুল আনাম
২। মনোয়ার হোসেন
৩। আশরাফুল ইসলাম
৪। সফিউদ্দিন
৫। মোজাম্মেল হক প্রামাণিক
৬। শামসুল হক
৭। আফসার উদ্দিন বসুনীয়া
প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পর চিলাহাটি কলেজকে চিলাহাটি বাজারসংলগ্ন বর্তমান স্থানে স্থানান্তর করা হয়। সরবরাহকৃত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৬ সালে কলেজটি বর্তমান অবস্থানে স্থানান্তরিত হয়।
স্থানান্তরের সময় বর্তমান জায়গাটি একটি আধাপাকা ভবনসহ সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা Abandon Property ছিল। ওই ভবনে কিছু সময় একটি বিহারি পরিবার বসবাস করেছিল। পরবর্তীতে আশপাশের কেউ কেউ জায়গাটি দখলে নেওয়ার চেষ্টা করলে প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ জহিরুল ইসলাম তৎকালীন নীলফামারীর জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করে জায়গাটি কলেজের জন্য বরাদ্দের আবেদন করেন। জেলা প্রশাসক মৌখিক সম্মতি দেওয়ার পর পরবর্তীতে সরকারি আদেশের মাধ্যমে জায়গাটি চিলাহাটি কলেজের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়।
Abandon ভবনের সঙ্গে মন্টুরাম আগরওয়াল নামের একজন মারওয়াড়ি ব্যক্তির ২৩ শতক জমি ছিল। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশত্যাগ করলে পরবর্তীতে জায়গাটি একজন ব্যক্তি লিজ নেন। পরে বাংলাদেশ সরকার জায়গাটি কলেজের নামে বরাদ্দ দেয়।
চিলাহাটি কলেজের ইতিহাসে ১৯৮৭ সাল একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ওই বছর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ চিলাহাটিতে একটি জনসভায় যোগ দেন। সে সময় এলাকাবাসী বিভিন্ন দাবির পাশাপাশি দুটি প্রধান দাবি তাঁর কাছে তুলে ধরেন।
প্রথম দাবি ছিল চিলাহাটি কলেজ জাতীয়করণ করা। দ্বিতীয় দাবি ছিল ভোগডাবুড়ী, কেতকীবাড়ি, গোমনাতি ও জোড়াবাড়ি ইউনিয়ন নিয়ে চিলাহাটিতে সাব-ডিস্ট্রিক্ট ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিস প্রতিষ্ঠা করা।
জনসম্মুখে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ চিলাহাটি কলেজ জাতীয়করণের ঘোষণা দেন। এরপর কলেজটির নাম হয় “চিলাহাটি সরকারি কলেজ”।
১৯৮৭ সালে কলেজটিকে জাতীয়করণের উদ্দেশ্যে গঠিত ‘ডিড অব গিফট কমিটি’র সম্মানিত সদস্যদের মধ্যে ছিলেন—
১। জহিদুল ইসলাম — প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি
২। খায়রুল আনাম — জমিদাতা
৩। আ. তা. ম. জহিরুল ইসলাম — অধ্যক্ষ
৪। মোজাম্মেল হক প্রামাণিক
৫। আফসার উদ্দিন বসুনীয়া
৬। আব্দুল লতিফ সরকার
৭। এম. এস. এ. কাদের — শিক্ষক প্রতিনিধি
৮। আব্দুর রাজ্জাক বসুনীয়া
৯। নগেন্দ্র নাথ সরকার
প্রতিষ্ঠার পর থেকে চিলাহাটি সরকারি কলেজের অবকাঠামো ও শিক্ষা কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। একসময় যেখানে একটি আধাপাকা ভবনের দুটি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সেখানে উন্নত অবকাঠামো, আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার এবং ছাত্রছাত্রীদের আবাসনের ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও ধারাবাহিক উন্নয়নের মাধ্যমে কলেজটি একুশ শতকের শিক্ষাব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উপযোগী একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
চিলাহাটি সরকারি কলেজের মূল ক্যাম্পাসের উল্লেখযোগ্য স্থাপনা ও সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে—
১। ছয়তলা বিশিষ্ট বিজ্ঞান ভবন
২। তিনতলা বিশিষ্ট প্রশাসনিক ও একাডেমিক ভবন
৩। পাঁচতলা বিশিষ্ট নির্মাণাধীন ছাত্রী হোস্টেল
৪। নির্মাণাধীন অডিটোরিয়াম
৫। শহীদ মিনার
৬। কলেজ মসজিদ
৭। ছাত্র হোস্টেল, পুকুর, আবাদি জমি ও খেলার মাঠ
৮। পুরাতন একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবন
২০২৩ সালে চিলাহাটি সরকারি কলেজ ডোমার উপজেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (কলেজ) হিসেবে নির্বাচিত হয়।
এই কলেজ থেকে প্রতিবছর অনেক শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে। বিগত বছরগুলোতেও চিলাহাটি সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল করে আসছে।
চিলাহাটি সরকারি কলেজের ইতিহাস শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নয়; এটি চিলাহাটি অঞ্চলের মানুষের শিক্ষা বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা ও সম্মিলিত উদ্যোগেরও ইতিহাস। ১৯৭৩ সালে সীমিত অবকাঠামোর মধ্যে ৭৩ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যে প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা পরবর্তীতে জাতীয়করণ লাভ করে এবং সময়ের সঙ্গে অবকাঠামো ও শিক্ষা কার্যক্রমে বিস্তৃতি লাভ করেছে।
স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক-কর্মচারী, দাতা ও সহযোগীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠান আজ চিলাহাটি অঞ্চলের শিক্ষা ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এলাকার উচ্চশিক্ষার প্রসারে প্রতিষ্ঠিত।
সরকারি কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ।
ডোমার উপজেলার শ্রেষ্ঠ কলেজ নির্বাচিত।
শিক্ষার্থীদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সাফল্য।



