Nav-logo

১৯৭৪ সালের লঙ্গরখানা চিলাহাটির দুর্ভিক্ষের ইতিহাস

Md Masum Ahmed

Md Masum Ahmed

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১১:৪০ এএম

১৯৭৪ সালের লঙ্গরখানা চিলাহাটির দুর্ভিক্ষের ইতিহাস

১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে চিলাহাটিতে চালু ছিল তিনটি লঙ্গরখানা। প্রবীণদের স্মৃতিতে সংরক্ষিত সেই লঙ্গরখানাগুলো আজ চিলাহাটির ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

১৯৭৪ সাল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কঠিন ও বেদনাদায়ক সময় হিসেবে স্মরণীয়। স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছর পর দেশটি বন্যা, খাদ্যসংকট, মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি হয়। এরই মধ্যে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের জীবনকে গভীরভাবে বিপর্যস্ত করে।

এই দুর্ভিক্ষের সময় ক্ষুধার্ত ও অসহায় মানুষের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে লঙ্গরখানা বা বিনামূল্যে খাবার বিতরণের কেন্দ্র চালু করা হয়। চিলাহাটিও এই পরিস্থিতির বাইরে ছিল না। স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিতে ১৯৭৪ সালের সেই লঙ্গরখানাগুলো আজও দুর্ভিক্ষের দিনগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হয়ে আছে।

১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপট

১৯৭৪ সালের বর্ষা ও বন্যা দেশের খাদ্য ও যোগাযোগব্যবস্থার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলের বেশ কিছু এলাকায় বন্যা ও খাদ্যসংকটের প্রভাব তীব্র হয়ে ওঠে। একই সময়ে খাদ্যের দাম বৃদ্ধি এবং দরিদ্র মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতার সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সবচেয়ে তীব্র সময় ছিল মূলত জুলাই থেকে অক্টোবর। রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেটসহ কয়েকটি অঞ্চল বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

গবেষণায় দেখা যায়, দুর্ভিক্ষের সময় শুধু দেশে খাদ্য কতটা ছিল সেটিই সমস্যা ছিল না; অনেক মানুষের কাছে খাদ্য কেনার বা সংগ্রহ করার মতো পর্যাপ্ত অর্থ ও সুযোগও ছিল না। ফলে খাদ্য থাকা সত্ত্বেও বহু মানুষ অনাহার ও অপুষ্টির ঝুঁকিতে পড়ে।

লঙ্গরখানা কী ছিল?

দুর্ভিক্ষের সময় অসহায় ও ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য যে বিনামূল্যের খাবার বিতরণ বা খাওয়ানোর কেন্দ্র স্থাপন করা হয়, সেগুলোকে বলা হতো লঙ্গরখানা। ইংরেজি গবেষণায় এগুলোকে langarkhana, feeding camp বা gruel kitchen হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।

১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরের দিকে সরকার ব্যাপকভাবে লঙ্গরখানা চালু করে। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, এক পর্যায়ে সারাদেশে প্রায় ৫,৮০০ থেকে ৫,৯০০টি লঙ্গরখানা চালু ছিল এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রতিদিন প্রায় ৪৩ লাখ মানুষ এসব কেন্দ্র থেকে খাবার পেত।

তবে এসব লঙ্গরখানায় খাবারের পরিমাণ সবসময় পর্যাপ্ত ছিল না। গবেষণায় এমন বিবরণও পাওয়া যায় যে, বিশেষ করে রংপুর অঞ্চলের কিছু মানুষ কয়েক মাইল হেঁটে লঙ্গরখানায় এসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অল্প পরিমাণ খাবার পেতেন।

চিলাহাটিতে ১৯৭৪ সালের তিনটি লঙ্গরখানা

চিলাহাটির স্থানীয় ইতিহাসের জন্য ১৯৭৪ সালের লঙ্গরখানার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চিলাহাটির প্রবীণ বাসিন্দা জাহাঙ্গির আলম-এর সাক্ষাৎকারে তৎকালীন সময়ের তিনটি লঙ্গরখানার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তাঁর স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, চিলাহাটিতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় লঙ্গরখানা পরিচালিত হতো তিনটি স্থানে:

  1. চিলাহাটি ডাকবাংলো
  2. চিলাহাটি গার্লস স্কুল
  3. গোসাইগঞ্জ বাজার

এই তিনটি স্থান তখন ক্ষুধার্ত ও খাদ্যসংকটে থাকা মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল ও খাদ্য পাওয়ার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।

এখানে উল্লেখ করা জরুরি যে, চিলাহাটির এই তিনটি লঙ্গরখানার তথ্যটি একটি স্থানীয় মৌখিক ইতিহাসের সাক্ষাৎকার থেকে পাওয়া। তাই এটিকে জাতীয় পর্যায়ের সরকারি পরিসংখ্যানের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়। বরং এটি চিলাহাটির স্থানীয় মানুষের প্রত্যক্ষ স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

লঙ্গরখানায় মানুষের ভিড়

১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় গ্রামাঞ্চলের বহু মানুষ খাবারের সন্ধানে নিজেদের এলাকা ছেড়ে অপেক্ষাকৃত জনবহুল স্থানে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। লঙ্গরখানাগুলো তাই শুধু খাবার বিতরণের স্থান ছিল না; এগুলো হয়ে উঠেছিল দুর্ভিক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের শেষ আশ্রয়গুলোর একটি।

জাতীয় পর্যায়ের গবেষণায় রংপুরকে দুর্ভিক্ষে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জেলার একটি হিসেবে দেখা হয়েছে। এক পর্যায়ে রংপুর জেলায় প্রতিদিন প্রায় ৯ লাখ ৩৬ হাজার মানুষ লঙ্গরখানা থেকে খাদ্য সহায়তা পেত বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

চিলাহাটিও তৎকালীন বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ায় স্থানীয় স্মৃতিতে লঙ্গরখানার ঘটনা ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উঠে আসে।

কী ধরনের খাবার দেওয়া হতো?

লঙ্গরখানায় মূল উদ্দেশ্য ছিল ক্ষুধার্ত মানুষকে অন্তত কিছু খাবার সরবরাহ করা। বিভিন্ন গবেষণায় তৎকালীন লঙ্গরখানায় রুটি বা চাপাটি এবং অন্যান্য সাধারণ খাদ্য দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কেন্দ্রভেদে খাবারের ধরন ও পরিমাণে পার্থক্য ছিল এবং অনেক ক্ষেত্রেই খাবারের পরিমাণ ছিল খুবই সীমিত।

এ কারণে লঙ্গরখানা মানুষের জীবন রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ত্রাণব্যবস্থা হলেও, এটি সব মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম ছিল না।

চিলাহাটির মানুষের স্মৃতিতে সেই সময়

চিলাহাটির প্রবীণদের স্মৃতিতে ১৯৭৪ সালের সময়টি শুধু একটি দুর্ভিক্ষের বছর নয়; এটি ছিল খাদ্যের জন্য মানুষের সংগ্রামের সময়।

স্থানীয় সাক্ষাৎকারে সেই সময়ের খাদ্যসংকট, বাজারের অবস্থা এবং মানুষের দুর্ভোগের কথা উঠে এসেছে। প্রবীণদের স্মৃতিতে তখন অনেক পরিবারের ঘরে পর্যাপ্ত খাবার ছিল না এবং সাধারণ মানুষকে খাদ্যের জন্য বিভিন্ন জায়গায় যেতে হতো।

চিলাহাটির তিনটি লঙ্গরখানা—ডাকবাংলো, গার্লস স্কুল এবং গোসাইগঞ্জ বাজার—সেই সময়ের স্থানীয় সামাজিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন হয়ে আছে।

কখন লঙ্গরখানাগুলো বন্ধ হয়?

১৯৭৪ সালের শেষ দিকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে শুরু করে। বিশেষ করে নতুন আমন ধান ঘরে উঠতে শুরু করলে খাদ্যসংকটের তীব্রতা কমতে থাকে।

জাতীয় পর্যায়ের গবেষণায় দেখা যায়, নভেম্বরের শেষ দিকে লঙ্গরখানাগুলোর কার্যক্রম ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়।

চিলাহাটির স্থানীয় স্মৃতিতেও ১৯৭৪ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে আমন ধান কাটার সময় লঙ্গরখানাগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় স্মৃতি

১৯৭৪ সালের লঙ্গরখানা শুধু তৎকালীন সরকারের ত্রাণ কার্যক্রমের ইতিহাস নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাধারণ মানুষের ক্ষুধা, দারিদ্র্য, সংগ্রাম এবং বেঁচে থাকার গল্প।

চিলাহাটিতে ডাকবাংলো, গার্লস স্কুল ও গোসাইগঞ্জ বাজারে পরিচালিত তিনটি লঙ্গরখানার স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জাতীয় ইতিহাসের বড় ঘটনাগুলো স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের জীবনে কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল।

আজ এসব লঙ্গরখানা আর নেই। কিন্তু প্রবীণ মানুষের স্মৃতিচারণ, মৌখিক ইতিহাস এবং স্থানীয় নথি সংরক্ষণের মাধ্যমে সেই সময়ের ঘটনাগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সম্ভব।

চিলাহাটি আর্কাইভে ১৯৭৪ সালের লঙ্গরখানার এই স্মৃতি তাই শুধু একটি দুর্ভিক্ষের বিবরণ নয়; এটি চিলাহাটির মানুষের কঠিন সময় পার করে বেঁচে থাকার ইতিহাসের একটি অংশ।

আপনার কাছে কি চিলাহাটির কোনো তথ্য আছে?

আপনার কাছে থাকা পুরোনো ছবি, দলিল, গল্প বা স্মৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হোন।