
Md Masum Ahmed
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৬:০৮ এএম

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে চিলাহাটি ৬ নম্বর সেক্টরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাব-সেক্টর হিসেবে ভূমিকা রাখে। ৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ চিলাহাটি হানাদারমুক্ত হয়—জানুন সেই সময়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে চিলাহাটি ছিল উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তবর্তী জনপদ। ভৌগোলিক অবস্থান, রেল যোগাযোগ এবং ভারতের সীমান্তের নিকটবর্তী হওয়ায় মুক্তিযুদ্ধের সময় চিলাহাটি ও এর আশপাশের এলাকা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের সময় নীলফামারী অঞ্চল ৬ নম্বর সেক্টরের আওতাধীন ছিল এবং এই সেক্টর থেকে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযান পরিচালিত হয়।
১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি বাহিনীর দমন-পীড়ন শুরু হওয়ার পর উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য এলাকার মতো চিলাহাটিতেও মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়। সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে ভারতীয় ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে চিলাহাটি ও আশপাশের অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখলে রাখার চেষ্টা করে। চিলাহাটিও তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল না। স্থানীয় মানুষের ওপর নজরদারি, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজনকে দমন এবং এলাকায় সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালানো হয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশকে কয়েকটি সামরিক সেক্টরে ভাগ করে যুদ্ধ পরিচালনা করা হয়। নীলফামারীসহ উত্তরাঞ্চলের একটি বড় অংশ ৬ নম্বর সেক্টরের আওতাধীন ছিল। এই সেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন উইং কমান্ডার এম. কে. বাশার।
৬ নম্বর সেক্টরের আওতাধীন এলাকাগুলোতে মুক্তিযোদ্ধারা সীমান্তবর্তী ঘাঁটি ব্যবহার করে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করেন। সীমান্তবর্তী অবস্থানের কারণে চিলাহাটিও এই সামগ্রিক যুদ্ধপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী চিলাহাটিতে অবস্থান নিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। স্থানীয় বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় চিলাহাটিতে পাকিস্তানি বাহিনীর সামরিক উপস্থিতি এবং সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতনের কথা উঠে এসেছে।
তবে চিলাহাটিতে সংঘটিত প্রতিটি নির্দিষ্ট ঘটনা, হতাহতের সংখ্যা বা নির্যাতনের বিস্তারিত তথ্যের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক নথি সীমিত। তাই যাচাই করা যায়নি এমন সংখ্যা বা ঘটনার বিবরণ এখানে যুক্ত করা হয়নি।
১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে মুক্তিযুদ্ধ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালে উত্তরাঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর অগ্রযাত্রা দ্রুত বাড়তে থাকে। পাকিস্তানি বাহিনী বিভিন্ন এলাকা থেকে পিছু হটতে শুরু করে এবং একের পর এক অঞ্চল মুক্ত হতে থাকে।
এই সময় উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রযাত্রার ধারাবাহিকতায় চিলাহাটিতেও পাকিস্তানি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে। সীমান্তবর্তী অবস্থানের কারণে চিলাহাটি থেকে আশপাশের এলাকাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও সামরিক তৎপরতার গুরুত্বও বৃদ্ধি পায়।
৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ চিলাহাটির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। স্থানীয়ভাবে এই দিনটি চিলাহাটি মুক্ত দিবস হিসেবে পালিত হয়। প্রথম আলোর প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর চিলাহাটি পাকিস্তানি বাহিনীর দখল থেকে মুক্ত হয়।
মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রযাত্রা এবং পাকিস্তানি বাহিনীর পশ্চাদপসরণের মধ্য দিয়ে চিলাহাটিতে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মাধ্যমে দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে চিলাহাটিও পাকিস্তানি বাহিনীর দখলমুক্ত একটি জনপদে পরিণত হয়।
চিলাহাটি মুক্ত হওয়ার পর উত্তরাঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধ দ্রুত বিজয়ের দিকে এগিয়ে যায়। এর মাত্র কয়েক দিন পর, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে।
চিলাহাটির মুক্তির ঘটনা তাই শুধু স্থানীয় ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়; এটি উত্তরাঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ের অগ্রযাত্রা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের সামগ্রিক ইতিহাসেরও একটি অংশ।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে চিলাহাটির অবস্থান ও হানাদারমুক্ত হওয়ার ইতিহাস আজও স্থানীয় মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ৫ ডিসেম্বরের মুক্তির স্মৃতি চিলাহাটির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।