
Md Masum Ahmed
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৪:৪৫ পিএম

একাদশ শতাব্দীর রাজা ভীমের ডোম সৈন্য ও লোকজ জনশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে প্রাচীন 'ডোমন নগর' থেকে আজকের 'ডোমার' নামকরণের ইতিহাস এতে তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলার ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতির এক রোমাঞ্চকর অধ্যায় জুড়ে রয়েছে কৈবর্ত বিদ্রোহ এবং বরেন্দ্রভূমির স্বাধীন রাজা ভীমের নাম। বর্তমান নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার নামকরণের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে রাজা ভীমের বীরত্ব, ডোম সৈন্যের সামরিক তৎপরতা এবং ঐতিহাসিক জনপদ 'ডোমন নগর'-এর স্মৃতি। এই প্রবন্ধে প্রামাণিক ঐতিহাসিক দলিল ও লোকজ গবেষণার আলোকে পুরো বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
একাদশ শতাব্দীতে পাল রাজাদের দুর্বলতা, প্রশাসনিক অরাজকতা ও প্রজাপীড়নের সুযোগ নিয়ে বরেন্দ্র অঞ্চলে (উত্তরবঙ্গ) কৈবর্ত নেতা দিব্য (বা দিব্যোক) এক সফল বিদ্রোহ করেন এবং পাল রাজাদের পরাজিত করে বরেন্দ্রভূমির ক্ষমতা দখল করেন। দিব্যের মৃত্যুর পর তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র ও উত্তরাধিকারী মহারাজা ভীম বরেন্দ্রভূমির সিংহাসনে আরোহণ করেন।
রাজা ভীম প্রায় ত্রিশ বছর অত্যন্ত সফলভাবে বরেন্দ্র অঞ্চল শাসন করেছিলেন। তিনি সামন্ত প্রভু ও প্রভাবশালী শোষকদের ক্ষমতা খর্ব করে সাধারণ কৃষক ও প্রজাদের কল্যাণে কাজ করেন। তাঁর এই জনদরদী ও সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সাধারণ মানুষের কাছে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন এবং তাঁকে "মহামহিম" বলা হতো। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁর নানা কীর্তি যেমন—দিবর দীঘি, ঐতিহাসিক দিবর জয়স্তম্ভ ও ভীমের জাঙ্গাল আজও তাঁর প্রকৌশল ও ক্ষমতার পরিচয় বহন করছে।
পাল বংশের পুনরুত্থান ঘটিয়ে রাজা রামপাল তাঁর হারিয়ে যাওয়া রাজ্য বরেন্দ্রভূমি পুনরুদ্ধার করার জন্য বিশাল সেনদল ও বহু সামন্ত রাজাদের একত্রিত করে ভীমের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ঐতিহাসিক দলিল 'রামচরিতম' অনুযায়ী, রাজা ভীম অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে পাল সেনাদলের বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এই যুদ্ধের সামরিক প্রস্তুতি ও প্রতিরক্ষা কৌশলের অংশ হিসেবে বরেন্দ্রভূমির উত্তর অংশ পর্যন্ত তাঁর সামরিক ছাউনি ও কার্যক্রম বিস্তৃত ছিল। দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর ভীম পরাজিত ও সপরিবারে বন্দী/নিহত হন এবং বরেন্দ্র আবার পালদের অধিকারে চলে যায়।
বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক ইতিহাস থেকে জানা যায়, রাজা ভীমের সঙ্গে ডোমার নামকরণের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়:
"আগাডুম বাগাডুম ঘোড়াডুম সাজে,
ঢাক মৃদং ঝাঁজর বাজে"
গবেষকদের মতে, এই ছড়াটির পেছনের ঐতিহাসিক উৎস হলো রাজা ভীমের ডোম সৈন্যদের যুদ্ধের সুসজ্জিত প্রস্তুতি।
১. প্রধান গবেষণা গ্রন্থ (Primary Research Book):
গ্রন্থেরনাম: বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা: নীলফামারী।
সম্পাদক: শামসুজ্জামান খান।
প্রকাশক: বাংলা একাডেমি, ঢাকা।
প্রকাশকাল: জুন ২০১৪।
রেফারেন্সপৃষ্ঠা: ২৬৭ (ডোমার, গোমনাতি ও রাজা ভীমের নাতি)।
২. ঐতিহাসিক মূল দলিল (Original Historical Text):
গ্রন্থেরনাম: রামচরিতম (Ramcharitam)।
লেখক: সন্ধাকর নন্দী (একাদশ শতাব্দীর সমসাময়িক কবি)।
বিষয়বস্তু: রাজা ভীম ও পাল রাজা রামপালের যুদ্ধ এবং কৈবর্ত বিদ্রোহের বিস্তারিত বিবরণ।